বারীনাভ রোদ

গৌরব চক্রবর্তী


এই বারীনাভ দূরত্বে দাঁড়িয়ে যে সব মৃদু আলোগুলো আমার চোখ দিয়ে ক্রমাগত বয়ে যেতে পারে--- সেগুলো অশ্রু নয়, বাংলা অক্ষর। কবিতার পতন ও সমাপতনের পারম্পর্য নিয়ে যে সব আলোচ্য শব্দগুলো স্মৃতিখাতৠজমা হয়ে থাকল... কোন ডায়েরির পাতায় লুকিয়ে রাখব এখন তাদের? কোন স্মৃতিচর্চ ্চিত থানে এসে মাথা ঠুকবে এখন আমার না-বলা কথাগুলো? বারীনদাকে নিয়ে বলার মতো অফুরান কথা কেন যে কিছুতেই আমার কলমের ডগায় ধরা দিচ্ছে না আজ! কেন যে নিজেকে বারবার পালিয়ে পালিয়ে বেড়ানো একটা মানুষের মতো মনে হচ্ছে! কী কী বলার আছে, কী কী বলার বাকি থেকে যায় এক প্রিয়জনের অনন্তলোক প্রাপ্তির পর? তার সম্পর্কে চাগাড় দিয়ে ওঠা স্মৃতিগুলৠও কি আর আপতকালে অনুবাদ করে তোলা যায় না? না! যাচ্ছে না তো কিছুতেই! তবু যা বলার, সেইসব অসংলগ্ন স্মৃতিচারণ ের একটা ব্যর্থ প্রচেষ্টা আমাকে ভেতর থেকে সুড়সুড়ি দিয়ে চলেছে... পুব আর ফুরোচ্ছে না কিছুতেই!

বারীন ঘোষালের সাথে যখন আমার পরিচয় ঘটল তখন আমি বাংলা কবিতার এই বিস্তৃতি ও বহুমাত্রিঠজগতের বিস্ময়প্রা প্ত এক বালকমাত্র (এখনও তা-ই)। ২০১১ সালের শুরুর দিকেই জলপাইগুড়ি শহরে 'এখন'-এর কবিতা আড্ডায় গিয়েছি। à§©-৪ টে কলম মাত্র ক্ষয়ে গেছে আমার কবিতাযাপনৠততোদিন। সেখানে কবিতা পড়েছি সন্ধ্যায়। রাতে আমি ও কয়েকজন আমার সমসাময়িক কবিবন্ধু মিলে থেকেছি এক অগ্রজ কবির বাড়িতে। পরদিন সকালে সবাই মিলে দু-একদিনের জন্য ডুয়ার্সের এক বনবাংলোয় জঙ্গলযাপনৠ‡à¦° পরিকল্পনাॠকিন্তু পূর্বনির্ঠারিত প্রস্তুতির অভাবে নিজের অজ্ঞতায় সেই সুযোগ আমার কপালে জোটেনি। তো, ভোরবেলা গাড়ি যখন এসে উপস্থিত, আমার গতরাত্রির সঙ্গীরাও যখন যাওয়ার জন্য তৎপর আমি তখন নিতান্ত ভিনগ্রহী এক অলৌকিক জীবের মতো বঞ্চিত মনে করছি নিজেকে, তখনই অতনুদা (বন্দ্যোপাঠ§à§à¦¯à¦¾à§Ÿ) রঞ্জনদা (মৈত্র) জানালেন যে, 'গৌরব রে, বারীনদা তোর খোঁজ করছিল। কাল রাতে তুই কবিতা পড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর... দেখা করে নে একবার'! আমি আকাশ থেকে পড়লাম। বারীন ঘোষাল? চুপচাপ গাড়ির দরজার কাছে দাঁড়াতেই কাচ নেমে এল... শুধু এইটুকু নয়,খুলে গেল দরজাও! 'তুই যাচ্ছিস না আজ'? আমার নির্বাক প্রত্যুত্ত রের বিপরীতে একটা শ্বেতপাথরৠর মুখে আংশিক মেঘাচ্ছন্ঠ¨ আলেয়া... দেখলাম। মাথা নেড়ে বললেন, 'ফোন করিস আমাকে। দেখা করিস আবার। আজ তো আর হবে না। এখুনি স্টার্ট দেবে গাড়ি'। আমি ওনার ফোন নম্বর সেভ করে রাখলাম। তারপর আমারই বিস্ময়ের পাশ কাটিয়ে দুটো বড় বড় গাড়ি কবিদের ভরাট করে নিয়ে এগিয়ে গেল জঙ্গলের স্নিগ্ধ অনুরাগের দিকে... আর আমার চোখ-মুখ জুড়ে লেগে রইল কবিতার কয়েক পশলা ওম।

আমি কি বিস্ময় জানি? আমি কি কবিতা জানি কিছু? আমি কি না-জানাটাই জেনেছি এখনও ভালো করে? কিছুদিন পরেই একটা ফোন। স্ক্রিনে ভেসে রইল একটা নাম 'Barin Ghoshal (Kobi)'। তখনও নামটা ' Barin da' হয়ে ওঠেনি। রিসিভ করতেই ওপার থেকে 'কী রে! ফোন করিসনি কেন? তোর নম্বরটা অতনুর থেকে নিলাম। তুই কি কলকাতায় আছিস এখন'? আমি বললাম 'না, রিষড়া'। উনি বললেন, 'তাহলে বিকেলে আয় কফিহাউজে'। ব্যাস, সেই থেকে আপন হয়ে গেল বারীন ঘোষাল। 'Barin da' হয়ে রয়ে গেল আমার ফোনবুকে। তারপর থেকে বহু আড্ডা, কবিতা নিয়ে আলোচনা, বেশিরভাগই অবশ্য ফোনে। বইমেলার সময় প্রতিবছর দেখা হত বারীনদার সঙ্গে নিয়মিত সেই ২০১১ সাল থেকে, এমনকি এবছর ২০১৭ বইমেলাতেও দেখা হল রোজ। তবে এই শেষবার মুখোমুখি সাক্ষাত। বারীনদা যেভাবে আপন করে নিতে জানেন সকলকে সেই চরিত্রটা খুব সংক্রামক তবে à¦…à¦¨à¦¨à§à¦•à¦°à¦£à§€à§Ÿà ¤ পুরুলিয়াতৠএকবার তিনদিন ধরে টানা বারীনসঙ্গ লাভ করেছি। অনেক অনেক কবিতা শুনিয়েছি আর প্রতিটি কবিতার মোটিভ ও লাইন ধরে ধরে ধৈর্য্য নিয়ে প্রতিক্রিৠা দিয়েছেন বারীনদা। প্রতিবার আমার কবিতাবই উপহার দিয়েছি নিজে হাতে। একটু দেরিতে হলেও পাঠপ্রতিকৠরিয়া জানিয়ে ঋদ্ধ করেছেন মানুষটা আমাকে। তিনি ছিলেন একাধারে একজন পরম বন্ধু, একজন সুদক্ষ গুরু ও একজন প্রকৃত অভিভাবক... সেই সঙ্গে একজন সত্যিকারেঠ° বড় কবি!

একটি মৃত্যুর অপার্থিব দূরত্বে দাঁড়িয়ে ডানা ঝাপটাচ্ছে স্মৃতি। বারীন ঘোষালের কবিতাকে বুঝতে হলে নিজেকে উদ্ভাবনী ক্ষমতার শিখরে পৌঁছে দিতে হবে, তার à¦•à¦¬à¦¿à¦¤à¦¾à¦—à§à¦²à§‹à ° পাশাপাশি পড়ে ফেলতে হবে তার অনন্য à¦—à¦¦à§à¦¯à¦—à§à¦²à¦¿à¦•à ‡à¦“à¥¤ 'অতিচেতনার কথা' না পড়লে আমি টের পেতাম না যে বারীন ঘোষালের সৃষ্ট নতুন আঙ্গিকের এই কাব্যভাষাঠঅতল ভাঙচুরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এত এত গভীর বুনোট, কবিতার এযাবৎ সমস্ত মিথ ভেঙে দেওয়া এক নতুন বিনির্মিত নির্মাণ--- যা নিজেকেই পেরিয়ে যাওয়া, অতিক্রম করে আসা একেকটা মাইলফলক। যা চিরাচরিত সত্যকে ভেঙে একটা নতুন সত্য রচনা করার এবং পুনরায় সেই নতুন সত্যটিকেও অস্বীকার করে, তছনছ করে দিয়ে আরও আরও নতুন নতুন সত্যের ভিত্তিপ্রস ্তর স্থাপন এবং পুনরায় তাকে ধূলিসাৎ করে দেওয়ার এক আশ্চর্য অনুসন্ধানॠবারীনদার সাথে না মিশলে টের পেতাম না যে কী গভীর ছিল তার অধ্যয়ন, তার পাঠ, তার দর্শন এবং সাহিত্যের প্রতি সমর্পিত হৃদয়। আমার প্রথমদিকেঠ° কবিতাগুলো শুনে বারীনদা খুব উচ্ছ্বাস নিয়ে ফোন করে বলেছিলেন, 'বুঝলি গৌরব, লেখাটা তোর হাতে আছে... লিখে যা। নতুন নতুন করে ভাবতে থাক আর লিখে যা। তোর হবে'। কিন্তু পরের দিকেই একবার কথায় কথায় বারীনদা একদিন আমায় সেই ফোনমাধ্যমৠই জানিয়েছিলৠ‡à¦¨, ' তোর হাতে কিন্তু লেখাটা আছে! তুই জানিস যে কবিতাটা লিখতে হয় কীভাবে, কিন্তু কোথাও হয়ত আটকে যাচ্ছিস, পেরে উঠছিস না'! আমি আসলে হয়ত বারীনদার এই কথাটির অন্তর্নিহঠত পরামর্শটা ধরতেই পারিনি, উল্টে সামান্য অভিমান হয়েছিল। কিন্তু বারীনদা বরাবর সব ক্ষমা করে দিতে পারতেন। দিতেনও। প্রতিবছর ভালোপাহাড়ৠর কবিতার ক্যাম্পে যেতে বলতেন নিজে থেকে। ফোন করতেন। অপেক্ষা করতেন। যাওয়া হয়নি আজ অব্দি একবারও। ২০১২, ২০১৩, ২০১৪ এই তিনবছর পরপর সব ঠিকঠাক হওয়া সত্ত্বেও শেষ অবধি যাওয়া হয়ে উঠল না আমার বাকি বন্ধুদের আলস্যের কারণে। কিন্তু তারপরেও বারীনদা ডাকতে ছাড়েনি। আবার ডেকেছে, বলেছে 'এবার আর কারও ভরসা করিস না গৌরব। একাই চলে আয়। এখানে এলেই দেখবি অনেকে হয়ে গেছিস'। যাওয়া হয়নি তবুও। এই আক্ষেপ আমার রয়ে যাবে চিরটাকাল। বারীনদা নিজের বই উপহার দেওয়ার সময় কিছু না কিছু লিখে দিতেন প্রতিবার। 'পুব আর ফুরোয় না'- বইটিতে আমাকে লিখে দিয়েছিলেন, 'আমার সঙ্গে পুবে চল, গৌরব'--- সে যাওয়াও অধরা থেকে গেল! আসলে আমি বারবার এমন এক ঋষিপ্রতিম অভিভাবকের বাড়িয়ে দেওয়া হাত ধরতে ধরতেও ফসকে দিয়েছি নিজের অজান্তেই। বারীন ঘোষালকে যারা জেনেছেন, চিনেছেন তারা সকলেই জানেন যে তিনি ছিলেন নিঃসন্দেহৠএক চলমান à¦à¦¨à¦¸à¦¾à¦‡à¦•à§à¦²à§‹à ªà¦¿à¦¡à¦¿à§Ÿà¦¾--- এত গভীর ছিল তার পড়াশোনা, বইয়ের জগত, কবিতার বোধ এবং আত্মদর্শনॠসূর্যাস্তৠর দিকে গড়িয়ে যাওয়া একটা নদীর দিকেও তেমনই মুগ্ধতায় তাকিয়ে থাকতে পারতেন তিনি যতটা মুগ্ধতা নিয়ে তিনি দেখতেন ভোরের আলো থেকে খসে যাওয়া অনন্ত আকাশ। এত কবিতাবাজ, আড্ডাবাজ, বন্ধুবাজ মানুষ আমি আমার জীবনে খুব কম দেখেছি! বারীনদার বহির্দৃষ্ট ি ও অন্তর্দৃষৠটি দুটোই ছিল অসম্ভব তীক্ষ্ণ ও সূক্ষ্ম। তার আন্তরিকতা ছিল শিশুসুলভ ও স্ফটিকতুলৠয, স্বচ্ছ, প্রাণোচ্ছঠ² এবং আপাদমস্তক পজিটিভ। বহুবার আসতে চেয়েছেন আমার রিষড়ার ফ্ল্যাটে। বহুবার ডেকেছেন আমাকে তার জামশেদপুরৠর বাড়িতে। বহুবহুবার আমায় আহ্বান জানিয়েছেন এদিক সেদিক ঘুরতে বেরোনোর ও অফুরান কবিতাযাপনৠর অমোঘ হাতছানি মেলে দিয়েছেন। কোনোটাই হয়ে ওঠেনি আমার। আমি বারীনদাকে তেমনিভাবে ধরতেই পারিনি যেভাবে তিনি ধরা দিতে চেয়েছেন বারবার।